বাতাসে মৃত্যুর গন্ধ

মৃত্যু | মতি মিয়া পেশায় একজন রিকশা চালক। সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনি শেষে বাসায় এসে জম্পেশ ঘুম দেয়। পরের দিন সকালে উঠে আবারো রিকশা নিয়ে বেরিয়ে যায়। একা মানুষ, তেমন খরচ নেই। সামনে বিয়ে করবে, তাই টাকা-পয়সা জমাচ্ছে। অর্থ জমছেও বেশ, কারণ তার বাজে কোনও নেশা নেই। তবে তার একটা বাজে পেশা আছে! সে কবরস্থান থেকে লাশ চুরি করে বিক্রি করে! মৃত্যু নিয়ে তার ব্যবসা!

আজ সকাল থেকেই খুব বৃষ্টি। থেকে থেকে বিদ্যুৎ চমকে উঠছে। আকাশের এক মাথা থেকে আরেক মাথা চিরে দিচ্ছে সাদা-রুপালি স্ফুলিঙ্গ। পুরো গ্রাম অন্ধকার হয়ে আছে, কে জানে, হয়তো পুরো পৃথিবীই অন্ধকার হয়ে আছে।

পুরো এলাকা যখন জনমানবহীন, তখন একটা ভ্যান এগিয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। কোনও তাড়াহুড়া নেই ভ্যান চালকের, তাই প্যাডেল মারছে আস্তে আস্তে। ভ্যানটা চালাচ্ছে মতি মিয়া। পাশের বাসার জয়নালের কাছ থেকে সে মাঝে মাঝেই ভ্যানটা ভাড়া নেয়। বিনিময়ে জয়নালকে বেশ ভালো একটা অর্থ দেয়। নগদ নারায়ণ হওয়াতে ভ্যান নিয়ে মতি মিয়া কী করে, সেটা কখনো জয়নাল জিজ্ঞাস করে না। মতি মিয়াও বলে না, এই ভ্যান নিয়ে সে কবরস্থান থেকে লাশ চুরি করে! সে মৃত্যু নিয়ে ব্যবসা করে।

‘আইজকা পারলে দুইডা বডি গায়েব কইরা ফালামু’- প্যাডেল মারতে মারতে আপনমনেই হেসে উঠলো মতি মিয়া। গ্রামের এইদিকে এমনিতেও কেউ আসে না, আর আজকে তো ঘোর বর্ষণ! 

ওই তো দেখা যাচ্ছে কবরস্থানের গেটটা। মতি মিয়া অবশ্য গেটের সামনেই যায় না, রাস্তা ঘুরে পেছনে চলে গেলো বরাবরের মতোই। এতক্ষণ আত্মচিন্তায় মগ্ন ছিল বলে মতি বুঝতে পারেনি, আজকের বাতাসটা কেমন যেন। মৃত্যু মৃত্যু একটা ব্যাপার ঘুরছে সবজায়গায়! তবে কবরস্থানে ঢুকার সাথে সাথেই সে যেন বাতাসে ভেসে বেড়ানো আর্তনাদ শুনে ফেললো। সাথে সাথে শিউরে উঠলো মতি মিয়া!

‘এমুন লাগে ক্যান!’ চিন্তাটা মাথায় আসলেও মতি মিয়া ঠেলে দূরে সরিয়ে দেয়। কবরস্থানের পেছনের গেটে দাঁড়িয়ে কবর দেখছে মতি। খুব পুরানো কবর নেয়া যাবে না, পুরানো লাশ পচে উপরের মাটির চাপে কঙ্কাল ভেঙে যায়। মতি মিয়ার তো আসলে দরকার কঙ্কালটাই। মেডিকেল স্টুডেন্টরা এই কঙ্কাল চড়ামূল্যে কিনে নেয়।

ওই তো দেখা যাচ্ছে মোটামুটি নতুন একটা কবর। কোদাল নিয়ে ধীর পায়ে কবরের দিকে এগোল মতি মিয়া। সাথে সাথে আশেপাশেই কোথাও বিকট শব্দে বজ্রপাত হলো। ভয়ানকভাবে চমকে উঠলো মতি মিয়া!

‘ধুর, এই ঠাডা মরা রাইতে যে ক্যান আইছিলাম!’ স্বগতোক্তি করে কোদাল নিয়ে কবর খোঁড়া শুরু করলো মতি। মাটি খুরতে কষ্ট না হলেও ঝামেলা হচ্ছে কাদাপানিতে। সব মাটি কাদা হয়ে খোঁড়া জায়গাটা ভরে দিচ্ছে!

আধা ঘণ্টা পর ফিরে চলছে ভ্যানটা। ভ্যানের যাত্রী কালো কাপড়ে মোড়ানো একটা লাশ। লাশ তোলার সময় মতি মিয়া অন্ধকারে লাশের মুখ ঠাউর করতে পারেনি, তবে কেমন যেন চেনা চেনা লাগছিল লাশটা। তবে এই ধারণা মনে জায়গা দেয়নি সে। 

ভ্যান চালাতে চালাতে হঠাৎ কেমন যেন এক নড়াচড়ার আভাস পেলো মতি। তবে ওসব মনের ভুল চিন্তা করে চালাতেই লাগলো। একটু পর গলার পিছনে কার যেন নিঃশ্বাসের অনুভূতি পেলো মতি। সরসর করে তার ঘাড়ের পেছনে চুল দাঁড়িয়ে গেলো। সাহস করে পেছনে তাকাতে দেখলো, লাশের এক পাশের কাপড় সরে গেছে। আঁতকে উঠলো মতি। তবে সে ভ্যান চালানো বন্ধ করলো না! একটু পর পিছনে দুম করে শব্দ হতেই আতঙ্কে জমে গেলো মতি মিয়া! ধীরে ধীরে পেছনে তাকালো সে! যেন মৃত্যু কে খুঁজছে!

ভ্যানটা খালি! 

এবার শব্দটা হলো ভ্যানের সামনে থেকে। কেউ যেন খুব ধীরে ধীরে মতির একদম মুখের কাছে নিঃশ্বাস ফেলছে। তাকাবে না তাকাবে না করেও তীব্র আতঙ্ক নিয়ে সামনে ঘুরে চাইলো মতি মিয়া। সে তাকিয়ে আছে আরেকটি মতি মিয়ার দিকে। এই মতি মিয়ার সারা মুখে কামড়ানোর দাগ, কেউ যেন খুবলে খুবলে মতি মিয়ার মুখের মাংস খেয়ে নিয়েছে। এই মতি মিয়ার পুরো শরীর দুমড়ানো মুচড়ানো। শুধু মতি মিয়ার চোখ দুটি ভয়ংকর রাগে জ্বলছে! না না, এ মতি মিয়া না। মতি মিয়ার লাশ। কারণ কোনও জীবিত মানুষের চোখের দৃষ্টি এত ভয়ংকর হওয়া সম্ভব না। মৃত মতি মিয়া একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে জীবিত মতি মিয়ার দিকে! ধীরে ধীরে বাড়ছে বৃষ্টির বেগ। দমকা বাতাসে কেঁপে কেঁপে উঠছে আশেপাশের গাছের মগডালগুলো! বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে মৃত্যু র গন্ধ!

আরও পড়ুনঃ

9 thoughts on “বাতাসে মৃত্যুর গন্ধ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *